| বঙ্গাব্দ
ad728
ad728

মৃত্যু তোমায় ডাকে: চিরন্তন সত্যের আহ্বান ও পরকালের প্রস্তুতি

রিপোর্টারের নামঃ দৈনিক শিবপুর দর্পণ
  • আপডেট টাইম : 09-08-2026 ইং
  • 5225 বার পঠিত
মৃত্যু তোমায় ডাকে: চিরন্তন সত্যের আহ্বান ও পরকালের প্রস্তুতি
ছবির ক্যাপশন: সংগৃহিত ছবি

মৃত্যু তোমায় ডাকে: চিরন্তন সত্যের আহ্বান ও পরকালের প্রস্তুতি

মানজুর হোসাইন


ভূমিকা

মহাকালের আবর্তে মানবজীবন এক ক্ষণস্থায়ী স্টেশন মাত্র। এই স্টেশনের শেষ গন্তব্যের নাম ‘মৃত্যু’। পৃথিবীর বুকে যা কিছু দৃশ্যমান, তার সবকিছুরই সমাপ্তি আছে। রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্র, সুঠাম দেহের অধিকারী কিংবা দুর্বল—কাউকেই মৃত্যু ছাড় দেয় না। মৃত্যু এক অবধারিত, অনস্বীকার্য এবং চিরন্তন বাস্তবতা। প্রতিদিন আমাদের চোখের সামনে কতো মানুষ বিদায় নিচ্ছেন, কতো চেনা মুখ অচেনা হয়ে যাচ্ছে। তবুও মানুষ পার্থিব মোহে অন্ধ হয়ে মৃত্যুকে ভুলে থাকে। অথচ মৃত্যু প্রতি মুহূর্তে মানুষকে ডাকছে। যেকোনো সময়, যেকোনো স্থানে এই ডাক চলে আসতে পারে। তাই বুদ্ধিমানের কাজ হলো জীবনের আসল সত্যকে উপলব্ধি করা এবং মৃত্যুর পরবর্তী অনন্তকালের জীবনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা।


১. মৃত্যুর অবধারিত বাস্তবতা: কুরআন ও হাদীসের দৃষ্টিভঙ্গি

ইসলামী আকীদা ও বিশ্বাসের অন্যতম মূল ভিত্তি হলো পরকাল। আর পরকালের প্রবেশদ্বার হলো মৃত্যু। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে মৃত্যুর এই অনিবার্যতার কথা ঘোষণা করেছেন।

সর্বজনীন সত্য: আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
"প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আর তোমরা কিয়ামতের দিন নিজেদের প্রতিদান পূর্ণমাত্রায় পাবে।" (সূরা আল-ইমরান, আয়াত: ১৮৫)

পালানোর কোনো পথ নেই: মানুষ যতই শক্তিশালী হোক না কেন, মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার কোনো দুর্গ বা প্রযুক্তি মানুষ আবিষ্কার করতে পারেনি। আল্লাহ বলেন,
"তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই; যদি তোমরা সুদৃঢ় দুর্গের ভেতরেও অবস্থান করো।" (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৭৮)

সময়ের অমোঘ নির্ধারণ: মৃত্যুর একটি নির্দিষ্ট সময় রয়েছে, যা কারো জন্য এক সেকেন্ড আগেও হবে না, পরেও হবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন,
"যখন তাদের নির্ধারিত সময় আসবে, তখন তারা এক মুহূর্তও পিছিয়ে যেতে পারবে না এবং এগিয়েও আসতে পারবে না।" (সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৬১)

রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সবসময় উম্মতকে এই চিরন্তন সত্যটি মনে রাখার তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,

"তোমরা জীবনের স্বাদ বিনষ্টকারী মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করো।" (জামে আত-তিরমিযী)


২. হঠাৎ আগমন ও গাফিলতির অবসানঃ

মৃত্যুর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর আকস্মিকতা। মৃত্যু কোনো বয়স, রোগ বা পূর্বসংকেতের পরোয়া করে না। এক মূহূর্ত আগে যে মানুষটি হাসছিল, পরের মুহূর্তেই সে লাশ হয়ে যেতে পারে। আমরা প্রায়ই ভাবি, বৃদ্ধ হলে বা অবসর নিলে ইবাদত করব, পাপ ছেড়ে দেবো। কিন্তু মালাকুল মাউত (আজরাঈল আ.) যখন আল্লাহর নির্দেশে হাজির হন, তখন অনুশোচনা করার আর কোনো সুযোগ থাকে না।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা মানুষের এই গাফিলতি বা উদাসীনতার চিত্র তুলে ধরে বলেছেন:

"মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় ঘনিয়ে এসেছে, অথচ তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে।" (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ১)

পার্থিব জীবনের ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি এবং পদের অহংকার মানুষকে মৃত্যুর কথা ভুলিয়ে রাখে। আল-কুরআনে সতর্ক করে বলা হয়েছে:

"প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের মোহগ্রস্ত করে রেখেছে, যতক্ষণ না তোমরা কবরে প্রবেশ করো।" (সূরা আত-তাকাসুর, আয়াত: ১-২)


৩. পরকালের চিরস্থায়ী জীবন ও ভালো থাকার উপায়ঃ

ইসলামের দৃষ্টিতে মৃত্যু কোনো শেষ নয়, বরং এটি একটি জীবন থেকে অন্য একটি স্থায়ী জীবনে স্থানান্তরের সেতু মাত্র। দুনিয়ার জীবন হলো পরীক্ষা ক্ষেত্র, আর পরকাল হলো ফলাফল ভোগের স্থান। মৃত্যুর পর মানুষের দুটি ঠিকানা—জান্নাত অথবা জাহান্নাম। সেই অনন্তকালের জীবনে ভালো থাকা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার জন্য ইসলাম আমাদের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। কুরআন ও হাদীসের আলোকে পরকালে মুক্তি ও শান্তি পাওয়ার মূল আমলগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

ক. খাঁটি ঈমান ও তাওহীদ প্রতিষ্ঠাঃ

পরকালে মুক্তির প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাস বা ঈমান আনা। আল্লাহর জাত ও সিফাতের (গুণাবলী) সাথে কাউকে শরিক না করা (শিরকমুক্ত থাকা)। শিরক হলো সবচেয়ে বড় জুলুম, যা মানুষের সমস্ত আমল ধ্বংস করে দেয়। খাঁটি ঈমানে বলীয়ান হয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে পারলে জান্নাত নিশ্চিত।

খ. ফরজ ইবাদতসমূহের যথাযথ পালনঃ

ইসলামের খুঁটিগুলোর ওপর আমল করা পরকালের শান্তির ভিত্তি। কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব নেওয়া হবে।


সালাত (নামাজ): 

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "কেয়ামতের দিন বান্দার আমলসমূহের মধ্যে সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব নেওয়া হবে।" যদি নামাজ ঠিক থাকে, তবে সে সফল হবে।


অন্যান্য ফরজ: 

রমজানের রোজা, সামর্থ্যবানদের জন্য যাকাত প্রদান এবং হজ সম্পাদন করা আবশ্যক। ফরজ আমল বাদ দিয়ে নফল আমল দিয়ে পার পাওয়া সম্ভব নয়।

গ. তওবা ও ইস্তিগফারের অভ্যাসঃ

মানুষ ভুল ও পাপের ঊর্ধ্বে নয়। তবে শ্রেষ্ঠ পাপী সেই, যে পাপ করার পর আল্লাহর কাছে অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চায়। প্রতিদিন ঘুমানোর আগে এবং অবসরে বেশি বেশি 'আস্তাগফিরুল্লাহ' পড়া উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন:

"হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর দরবারে তওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।" (সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩১)

ঘ. সাদাকায়ে জারিয়াহ ও স্থায়ী আমলঃ

মানুষের মৃত্যুর সাথে সাথে তার আমলনামা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু কিছু বিশেষ আমল আছে, যার সওয়াব কবরে শুয়ে শুয়েও পাওয়া যায়। একে সাদাকায়ে জারিয়াহ বলে। হাদীস শরীফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার তিনটি আমল ছাড়া সব আমল বন্ধ হয়ে যায়; ১. সাদাকায়ে জারিয়াহ (চলমান দান), ২. এমন জ্ঞান যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং ৩. এমন সৎ সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।" (সহীহ মুসলিম)

তাই জীবনে বেঁচে থাকতেই কোনো মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, নলকূপ স্থাপন বা দ্বীনি বইপত্র বিতরণের মতো স্থায়ী কল্যাণের কাজ করে যাওয়া উচিত।

ঙ. সুন্দর চরিত্র ও মানুষের হক (হককুল ইবাদ) আদায়ঃ

ইসলামে শুধু আল্লাহর ইবাদতই যথেষ্ট নয়, মানুষের সাথে আচরণ কেমন ছিল তাও বিচার করা হবে। কারো অর্থ আত্মসাৎ করা, গীবত বা পরনিন্দা করা, কাউকে কষ্ট দেওয়া—এগুলো বড় গুনাহ। আল্লাহ নিজের হক ক্ষমা করলেও মানুষের হক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ক্ষমা না করলে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, "তোমরা কি জানো নিঃস্ব কে?" সাহাবিরা বললেন, যার টাকা-পয়সা নেই। রাসুল (সা.) বললেন, "আমার উম্মতের মধ্যে নিঃস্ব সেই ব্যক্তি, যে কেয়ামতের দিন নামাজ, রোজা, যাকাত নিয়ে হাজির হবে; কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়েছিল, কারো ওপর অপবাদ দিয়েছিল, কারো রক্তপাত করেছিল। ফলে তার নেক আমলগুলো তাদের দিয়ে দেওয়া হবে। একপর্যায়ে তার নেক আমল শেষ হয়ে গেলে তাদের গুনাহগুলো তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।" (সহীহ মুসলিম)


৪. মৃত্যুর প্রস্তুতির ব্যবহারিক পদক্ষেপঃ

আমাদের প্রতিদিনের জীবনে কিছু অভ্যাসের মাধ্যমে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত:


১. অসিয়তনামা তৈরি রাখা: নিজের ঋণ, আমানত এবং দ্বীনি বিষয়ে পরিবারের জন্য অসিয়ত লিখে রাখা সুন্নাত।

২. কবর জিয়ারত করা: রাসুলুল্লাহ (সা.) কবর জিয়ারত করতে উৎসাহিত করেছেন, কারণ এটি মনকে নরম করে এবং আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

৩. নেককার মানুষের সংশ্রব: সৎ ও দ্বীনদার মানুষের সাথে চললে আল্লাহর স্মরণ বাড়ে এবং পাপ থেকে দূরে থাকা সহজ হয়।

৪. দিনের হিসাব রাতে নেওয়া: প্রতিদিন ঘুমানোর আগে সারাদিনের ভালো ও মন্দ কাজের একটি আত্মপর্যালোচনা (মুহাসাবা) করা উচিত।


উপসংহার

মৃত্যু আমাদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে। আমরা যতই এর থেকে দূরে সরতে চাই না কেন, এটি আমাদের সামনে এসে দাঁড়াবেই। আয়নার সামনে দাঁড়ালে চুলে পাক ধরা, শরীরের শক্তি কমে যাওয়া—এগুলো সবই মৃত্যুর নীরব বার্তা। দুনিয়ার এই জীবন কেবলই একটা পরীক্ষা, যার ফলাফল নির্ধারিত হবে হাশরের ময়দানে।

তাই আসুন, অলসতা ও উদাসীনতা ঝেড়ে ফেলে আজই, এই মুহূর্ত থেকেই আল্লাহর পথে ফিরে আসি। খাঁটি মনে তওবা করি, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো আদায় করি এবং মানুষের প্রতি দয়া ও ইনসাফ কায়েম করি। হে আল্লাহ! আমাদের সবাইকে মৃত্যুর ডাক আসার পূর্বেই পূর্ণ প্রস্তুতি নেওয়ার তাওফীক দান করুন এবং ঈমানের সাথে খাতিমা বিল খায়ের (উত্তম সমাপ্তি) নসীব করুন। আমীন

ad728

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ad728
ad728
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ দৈনিক শিবপুর দর্পণ | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ